নৃ-মুখ
অপ্রতিম হত্যায় কার দায় কতটুকু
জোবাইদা নাসরীন
জোবাইদা নাসরীন
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫৮ | আপডেট: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৩:৫৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
কিশোর অপ্রতিমের নৃশংস হত্যাকাণ্ড প্রায় সবাইকে নাড়া দিয়েছে। সম্ভবত অপ্রতিমের মা ড. নাহিদা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার কারণে এবং সন্তানের জন্য সামাজিক মাধ্যমে তাঁর যে আকুতি প্রকাশ পেয়েছে, তা দেশের বেশির ভাগ মানুষের মনে দাগ কেটেছে। অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও সত্য, সবার ক্ষেত্রে আমাদের এই অনুভূতি জাগে না। একই সময়ে আরও দুই শিশুর নিখোঁজের খবর সংবাদমাধ্যমে এলেও সেগুলো আমাদের সমপরিমাণ তটস্থ করেনি, বিচলিত করেনি। সম্ভবত এ কারণে শিশু নিখোঁজের ঘটনাও বন্ধ হচ্ছে না।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এক প্রতিবেদন জানিয়েছে, ‘২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত নিখোঁজ হওয়ার পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন ঘটনায় মোট ২৫৪ শিশুর মৃত্যুর তথ্য আসকের পর্যবেক্ষণে এসেছে’ (বিডিনিউজ২৪, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬)। নিখোঁজ শিশু অনেকের লাশ পাওয়া গেছে মাটিচাপা দেওয়া অবস্থায় হয়তো বাড়ির পাশে; কারও লাশ পাওয়া গেছে নদীতে। অন্যদিকে পুলিশ সদরদপ্তর গত ৩ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছে, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হয়েছে, যাদের মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জন উদ্ধার হলেও এখনও নিখোঁজ দুই হাজার ৩৮ জন, যা মোট নিখোঁজ শিশুর প্রায় ১৩ শতাংশ।
অপ্রতিম হত্যার পর সামাজিক মাধ্যমে বেদনা ও হাহাকারের পাশাপাশি কেন এ রকম হলো তা নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ চলছে। অনেকেই প্যারেন্টিং নিয়ে জ্ঞান দিচ্ছেন। সন্তান কী করছে, সে বিষয়ে অভিভাবকরা কতটুকু জানেন বা খেয়াল রাখছেন– সে আলোচনাও আছে। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, এত অল্প বয়সে শিশুর হাতে দামি মোবাইল ফোন কেন? আরও আলোচনায় আছে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভূমিকা।
অপ্রতিম কিংবা তার বাবা-মা কী করেছেন, সেটি দিয়ে কোনোভাবেই অপ্রতিম হত্যাকে জায়েজ করা যাবে না। আবার তার বাবা-মা কীভাবে সন্তানকে বড় করতে পারতেন; আরও কী কী করা প্রয়োজন ছিল, সেগুলোও অতি সরলীকরণ দোষে দুষ্ট বলে মনে হয়েছে আমার। আমরা কেউই কারও জীবন যাপন যেমন করি না, তেমনি বাবা-মা আর সন্তানের সম্পর্কের একক কোনো রূপ নেই। তাই কে কীভাবে সন্তানকে বড় করবে, সেটি একেবারে সেই পরিবারের আদর্শ, মানসিকতা, আর্থসামাজিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। তাই আসলে কোন বাবা-মা ব্যর্থ বা সফল– এ রকম বলা খুব কঠিন।
সন্তানকে সব সময় চোখে চোখে রাখবেন? কতটুকু চোখে চোখে রাখবেন? সবকিছু জানবেন; কীভাবে জানবেন? বাইরে বের হতে দেবেন; না দেবেন না? ঘরে থাকলেই কি সে নিরাপদ? মোবাইল ফোন যখন সে ছোটবেলা থেকে দেখে বড় হচ্ছে, আপনি-আমিই হয়তো খাওয়ার টেবিলে তাকে মোবাইল ফোন হাতে দিয়ে খাবার খাইয়ে বড় ধরনের আত্মতৃপ্তি খুঁজছি, তাহলে কতটুকু বয়স হলে তার থেকে ফোন কেড়ে নেবেন কিংবা ফোন দেবেন? সব কিছুই কিন্তু যদি-কিন্তুর অংশ এবং এগুলো নিয়েই সবচেয়ে বেশি খাবি খাচ্ছেন অভিভাবকরা।
সমস্যা আরও আছে। আমরা আবাসিক এলাকায় বড় হয়েছি। মনে আছে, পাশের ভবনের এক চাচা খুব বকা দিয়েছিলেন, কোনো একটা অন্যায় কাজ করার জন্য। কিন্তু অভিভাবকরা সেটিতে খুশি হয়েছেন। কারণ সমাজে তখন একে অন্যের সন্তানকে শাসন করার এক ধরনের অধিকার ভোগ করতেন। কিন্তু এখন শিক্ষকরাও যদি শিক্ষার্থী সম্পর্কে কোনো সতর্কতামূলক তথ্য অভিভাবকদের দেন, তখন অভিভাবকরা সেটি ভালোভাবে গ্রহণ করেন না। অনেক সময় শিক্ষক হিসেবে এমনও শুনতে হয়েছে, ‘আমার সন্তান নিয়ে আপনি বলার কে?’ তাই এখন সমাজের দায়িত্বও কেন জানি অনেকটা কম। কারণ এতে হিতে বিপরীত হচ্ছে বেশি।
এখনকার পরিবারগুলোতে বাচ্চা কম। বেশির ভাগেরই হয়তো এক-দুজন। তাই তারা বাচ্চাদের সব সময় অতি আহ্লাদে বড় করেন। সম্ভবত বাচ্চারাও অভিভাবকদের এই মনস্তাত্ত্বিক দেনদরবার বুঝে যায়। তাই কোনো কিছু অপছন্দ হলে কিংবা অভিভাবকরা কোনো কিছু নিয়ে বকাঝকা করলে তখন হুমকি আসে ‘আত্মহত্যা’র। তাই সন্তান হারানোর ভয়ে অভিভাবকরা অপছন্দ হলেও অনেক কিছু মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
বাকি থাকে রাষ্ট্র। এখন আসলে রাষ্ট্র কী ভূমিকা পালন করছে? অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে পুলিশের ভূমিকার প্রশংসা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘এখানে আমরা পুলিশের প্রশংসা করতে পারি যে তারা ১২ ঘণ্টার মধ্যে আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে। ফরেনসিক বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। পোস্টমর্টেম করে তার দাফন হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, অপরাধ কেন সংঘটিত হচ্ছে, তার পেছনে তাকালে অনেক ক্ষেত্রে মাদক ও জুয়ার সংশ্লিষ্টতা দেখা যায় (প্রথম আলো, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬)।
এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আমার জিজ্ঞাসা, অপ্রতিমকে হত্যার দায়ে গ্রেপ্তারকৃতদের ট্র্যাক রেকর্ড কিন্তু ভালো নয়। তাদের কারও বিরুদ্ধে আগে একাধিক অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ আছে। আগে কেন এদের সংশোধন করা গেল না? এ ছাড়া পুলিশের তথ্য অনুযায়ী এখনও যে দুই হাজার ৩৮ শিশু নিখোঁজ রয়েছে, তাদের খুঁজে পাওয়ার বিষয়ে সরকার কী ধরনের ভূমিকা নিচ্ছে? কারা এই শিশুদের নিখোঁজ করছে? কেন হঠাৎ এত শিশু নিখোঁজ হচ্ছে? এ বিষয়ে সরকার কতটুকু মনোযোগ দিচ্ছে? সরকার বলছে, মাদক এবং জুয়া রয়েছে। সেগুলো দমানোর জন্য কি টেকসই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে?
আমাদের মানতে হবে, সন্তান হারানোর ওপরে আর কোনো দুঃখ নেই। তাই প্যারেন্টিংয়ের ওপর দোষ দিয়ে কিংবা সন্তান কতটুকু উচ্ছন্নে গেল, সেটিও আলোচনার চেয়ে বড় বিষয় হলো সরকার একজন নাগরিকের নিরাপত্তা দিতে কতটুকু সমর্থ হচ্ছে– তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা।
জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
zobaidanasreen@gmail.com
- বিষয় :
- জোবাইদা নাসরীন